ট্রেন কাহিনী



বিপুল রায়
শিয়ালদহ স্টেশন। সারাক্ষণ পোকার মতন লোক– স্বচোক্ষে না দেখিলে হয়তো কাহ বিশ্বাস করিবে না। টিকিট বুকিং করা ছিলো না বুলি আগাদিনে আতিত অনলাইন বুকিং করিলুং। পরের দিনে সাঞ্ঝেরক্ষণ ট্রেন। কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। 

সমায় মতন ট্রেনোত উঠি বসিলুং। যায় যার মতন উঠি নিজ নিজ জাগাত যায়া বসিল। মোর সিট জানলার গোরত। বগোলের সিটখান ফাঁকা। কোলার ব্যাগটা সিটোত থুলুং মাত্র– একজন ভদ্র মহিলা আসিয়ায় কইল, “এক্সকিউজ মি...”
মাথাটা অঠে দেখিলুং অতি সুন্দরী ফুটফুটা একজন বৌ। সম্ভবত নয়া বিয়াও হইসে। কিছু না কয়া ব্যাগটা আরও কোলাত অঠে নিলুং। বৌটা বসিয়ায় হয়তো অস্বস্তিবোধ করিল। জানলার পাখে খানেক সরকি বসিলুং। তাও বৌটার উস্টুং-খুস্টুং দেখি পুছ করিলুং, কুনো সমস্যা নাকি বৌদি?
বৌটা খানেক পাতলা স্বরে ভদ্রভাবে কইল, “আসলে হামরা দুইজন তো। সাথে হাজব্যান্ডও আছে। বগলা-বগলি যুদি দুইটা সিট পালি হয়, তাহলে...”
আচ্ছা। এই ব্যপার। দাদা কোটে তাহলে?
ওপাকে। সিটটা অদল-বদল করিবেন কি প্লিজ?”
সিট কি জানলার গোরত?
“না না।”
তাহলে তো হবে না বৌদি। এতদূর যাইম– অনেক কষ্টে জানলার গোরের সিট পাসুং।... আসলে জানলার গোর মোর খুব পছন্দের জাগা। হিয়া জুড়ি দেখা যায় শান্ত-শিষ্ট প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য। উপভোগ করা যায় হিলহিলা-সিলসিলা বাও-বাতাসের পরশ।

ট্রেন অনেকদূর পৌঁছাইসে। প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য গহীন অন্ধকারের ভিতিরা ডুবি গেইসে ততক্ষণে। গাও ছুঁইয়া যাছে খালি হিলহিলা-সিলসিলা বাও।... একটা স্টেশনোত ট্রেন দাঁড়াইতেই হামার সিটখান ফাঁকা হয়া গেইল। এইটায় একটা সুযোগ– বৌদি যুদি পারে দাদাক আনি বগোলের সিটখানোত বসের পারে। সুযোগটা কাজোত নাগাইল বৌদি। দাদাও আসি বগলোত বসিল। বৌদি যে দাদার কোলাত মাথা রাখি এবারে পিথিবীর অসীম আনন্দ উপভোগ করিবে– তা সন্দেহ না করিলেও চলে। কারণ ব্যপারটা খুবে স্বাভাবিক। 

“চা’য়... চা’য়...” করিতে করিতে একজন চা-ওয়ালা উঠিল। এক কাপ গরম চা নিয়া গালাটা ভিজালুং।... ট্রেন আরও চলা শুরু করিল। কুন স্টেশন ছাড়ি যে কুন স্টেশন পৌঁছাছে– বুঝা মুশকিল! কায় অত লক্ষ্য করে স্টেশনের নাম। যাত্রী উঠা-নামা করেছে– এই দেখি দেখি সমায় কাটা ছাড়া আর উপায় নাই মোর। সাথে যুদি কুনো গল্পের বই বা কাব্যগ্রন্থ থাকিল হয়, তাহলে হয়তো অসুবিধাটা না হইল হয়। দাদা-বৌদির সাথে আলাপ করার মতন সিচুয়েশনও নাই! দুইজনে গভীর গল্পতে মগ্ন। কি হাসি কি ঠাট্টা...! আহা রে! দাদার বুকোত মাথা রাখি বৌদির মুখের কি মিষ্টি হাসি। বৌদির এমন অপরূপ রূপ দেখি চোখু যুনি সরির চায় না কুনোমতেই! পরার বৌ-বনুষের পাখে নজর দেওয়াটা ঘোর অপরাধ। মহাপাপ। জানোং। কিন্তু একটা দিন এই পাপ করিলে হয়তো নরকোত ঠাঁই হবে না নিশ্চয়। আর– সৌন্দর্য্য তো উপভোগ করিবারে বস্তু। এই ভাবি মনটাক আবোল-তাবোল কত কি বুঝালুং অনেক্ষণ!

একটা সমায় দাদার কোলাত মাথা রাখি বৌদি থাকি পড়িসে সিটের উপুরা। দাদাও আদরে আদরে বৌদির মাথাত হাত সত্তে দ্যাছে। উথুলি পড়া ভালোবাসা যাক কয়। কি রোমান্টিক দৃশ্য!

একটা স্টেশন পৌঁছি ট্রেনখান দাঁড়াইলে কিছু লোক উঠিল। মাত্র একজন বাদে বাকি সগায় বসির জাগা পাইসে। লোকটা বসির ইচ্ছাও প্রকাশ করে নাই। হয়তো বৌদির রূপ দেখি লোকটা সন্তুষ্ট হয়া গেইসে। এমন রূপসী তো আর সবসমায় চোখুত পড়ে না। কাজে এই নিরুপম রূপে যে কাহয় ঘায়েল হওয়ার কথা।... বৌদি নিজেই উঠি বসিল। লোকটাক সিট ছাড়ি দিল–বসির বাদে। তাতেই বুঝা গেইল, রূপের মতনে কলঙ্কহীন বৌদির মনটাও। দাদাটাকে খানেক কাঁকড়া-কুচিয়া মনে হইল। সিটটা ছাড়ি দেওয়াতে বৌদির উপুরা গরম হয়া গেইল! ফুস-ফাস করি হয়তো গালি-গালাজ করিল। বৌদির ফর্সা মুখখান নাল হয়া গেইল নিমেষেই! হাসি মুখখানও গোমড়া নাগিল!... ফুস-ফাস তর্কযুদ্ধটা কোনেক জোর গালায় শুনা গেইল! বৌদি তো কয়ায় ফেলাইল, “তোর সাথে আইসাটায় মোর ভুল হইল! ধুর...”
“ভুল হইসে! ধুর...” এই কয়া, গরম দ্যাখে দাদাও সিট ছাড়ি উঠি যায়া ট্রেনের দরজার ওটে দাঁড়াইল। বৌদি চুপচাপ বসি দাদার পাখে জুলজুল করি চায়া নইল! মায়া নাগে কাহকো এমন অবস্থায় দেখিলে। মনে হছে যুনি বৌদিটা কত অসহায়! চোখুর জল ছলমল করেছে। টুপুস-টাপাস করি দুই-একটা ফোঁটা হয়তো ট্রেনের মাঝিয়াতও পড়িল!

আরেকটা স্টেশনোত ট্রেন দাঁড়াইলে দাদা বৌদির আসল রহস্যটা ধরা পড়িল। স্যুট-বুটে, কালা কোট পিন্দি একজন টি.টি উঠিল কামড়াত। সগারে টিকিট চেকিং করেছে। দাদার মনোভাব দেখিয়ায় মনে হইল– টিকিট কাটে নাই! টি.টি বগোল আসিলে দাদা ট্রেনের টয়লেটের পাখে গেইল। কিন্তু ভাইগ্যটা এতটায় খারাপ– টয়লেটের ভিতিরা আগতে একজন ঢুকি ছিলো। দাদার আর টয়লেট ঢুকা হইল না। টি.টি টিকিট চান্দাইলে বৌদির পাখে দ্যাখে দ্যায়।... বৌদিরটেও দাদার টিকিট নাই! একখান মাত্র টিকিট– তাও বৌদির নামেই। দেখিলুং টুম্পা রায় বর্মন। দাদা বৌদির পাখে আগে আসি কইল, “মোর টিকিটখান?”
বৌদি বোধায় চমকি উঠিল। ভাবিলুং, টিকিট বোধায় হারে ফেলাইসে বৌদি! কিন্তু বৌদির যা উত্তর, তাতে মনে হইল না যে– দাদা টিকিট কাটিসে!

টি.টির হাতোত পড়ি যেহেতু টিকিট নাই– জরিমানা তো দিবার নাগিবেই। তা না হলে কেস পর্যন্ত হবার পারে– ধুমকি দিল টি.টি। বৌদির টুটি-মুখ বোধায় শুকি গেইল কথাটা শুনি। সামাইন্য কিছু টাকারে তো ব্যপার। দিয়া দিলেই সমস্যার সমাধান হয়া যায়। দাদা-বৌদি দুইজনে দুইজনকার মুখের পাখে জুলজুল করি চায়া নইল। বুঝিলুং– মামলা ঢিসমিস করির মতনও পরিস্থিতি উমার নাই।... টি.টি দাদার আইডি কার্ড চান্দাইল। বৌদি উয়ার ব্যাগ থাকি নিকিলি দিবার সমায় লক্ষ্য করিলুং– দাদার নাম রাজেন সিংহ। বৌদিটাক দেখি মায়া হইল মোর। বেচারি...! কলুং, বৌদি, কিছু টাকা দিয়া মামলা ঢিসমিস করিলেই তো হয়া যায়। বেকার কেনে ঝামলা বাড়ান!
কং না না-কং করিয়াও বৌদি কইল, “টাকা থাকিলে কি আর চুপচাপ থাকি!”
যুদি কিছু মনে না করিস– কয়ায় পাঁচশো টাকা বৌদির পাখে আগে দিয়া কলুং, আপাতত ঝামলাটা দূর করো। পরে না হয় মোক দিয়া দ্যান।... বৌদি ফট করি নির্দ্বিধায় টাকাটা নিয়া টি.টিক দিয়া অনেক কাকুতি-মিনতি করি সমস্যার সমাধান করিল।

দুই জনেরে নাম দেখিয়া মোর মনের ভিতিরা সন্দেহ হইসে– ইমিরা মাইয়া-ভাতার তো হবারে পারে না। কারণ এক জনের নাম টুম্পা রায় বর্মন আরেকজন রাজেন সিংহ। সুতরাং বৌদি বর্মন পরিবারের চেংড়ি– রায় পরিবারোত বিয়া হইসে। আর দাদা হইল সিংহ পদবীর। মিল নাই! সুতরাং ইমিরা মাইয়া-ভাতার হইলে নিঃসন্দেহে পদবীটায় তার পরিচয় দিল হয়।

পুছ করিলুং, ব্যপারটা কি?
থতমত হয়া বৌদিটায় উত্তর দিল, “কি ব্যপার মানে!”
“দাদা– মানে রাজেন সিংহ কি তোমার স্বোয়ামী?”
চিনোং না জানোং না বুলিয়ায় বোধায় বৌদি নির্দ্বিধায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ। কেনে?”
অবাক হয়া গেলুং উত্তরটা শুনি। কলুং, নামটা তাহলে টুম্পা রায় বর্মন ক্যাংকরি হইল! টুম্পা সিংহ বর্মন হওয়ার দরকার ছিলো।

মোর কথা শুনি শরোম খাইল বৌদিটা। শুরু করিল অতীত জীবনের কাহিনী। যার সারমর্ম এই– একটা সমায় রাজেন সিংহর সাথে উয়ার পিরিতী ছিলো। বাড়ি থাকি কাহ মানি ন্যায় নাই সম্পর্কটা! জোর-জবরদস্তি ঐন্যটে বিয়া দিসে! সুযোগ বুঝি আজি পুরানা প্রেমীকের হাত ধরি অচিন ঠিকিনাত যাছে। যেটে কুনো ঝই-ঝামেলা থাকিবে না।

কাহিনী শুনিয়া খুব খারাপ নাগিল। ফির মনে হছে, বিয়ার আগত বাইধ্য হয়া বৌদি এক জনোক ধোকা দিসে! বিয়ার পর এলা আর এক জনোক ধোকা দ্যাছে! ফির একবার ভাবেছোং– অমর প্রেম কাহিনী। যুগ যুগ বাঁচি থাউক এই ধরনের ভালোবাসা...।

আতিটা‌ যে কুদি কুদি বিতি গেইল– বুঝিরে পালুং না। সকাল নয়টার দিকে ট্রেন মোর গন্তব্যস্থল পৌঁছাইল। ব্যাগটা হাতোত নিয়া নামি পড়িলুং। আর ট্রেনের সেই দাদা-বৌদি কোটে যাবে– পুছা হয় নাই। হয়তো উমার গন্তব্যস্থল আরও বহুদূর...!

তারিখ: ১০.১২.২০২১ 

আপনিও লিখুন হামার বাও এ।

Post a Comment

Previous Post Next Post