তীর্থযাত্রী


বিপুল রায়
মাস কয়েক রোগ ভোগের পর এলা অনেকটায় সুস্থ্য তিলকচন। মন-মেজাটা ঝরঝরা করির বাদেও খানেক বায়রা ঘুরার দরকার।... শুনিসে– কুনদিন নাকি তীর্থযাত্রার বাস ছাড়িবে অশোকবাড়ি থাকি। উমার সাথেই ঘুরি আসিলে মন্দ হবে না। লোকটা ফির হরিভক্তা না হয়, কঠোর ধর্মিকও না হয়। নাস্তিক কইলেও ভুল হবে না। 

          অশোকবাড়ি থাকি সেদিন গাড়ি রিজার্ভ করা হইসে। বিশাল বড়ো বাস। তাও জাগা কুলবে কি না সন্দেহ আছে! ভালে ভিড় হইসে। তিলকচনও সেই ভিড় বাসের একটা সিট দখল করি বসিল।... মানষি এই একটা ক্ষেত্রেই দুর্বল– সেইটা হছে ধর্ম। সে যে কুনো ধর্মের লোকেই হউক না কেনে। ধর্ম বিষয়ক যে কুনো ক্ষেত্রেই মানষির মাথা নিচা হয়া যায়। সইত্য-মিথ্যা যাচাই অথবা ঠিক-ভুল বিচার করির মতন ক্ষমতাও হয় না সহজে। অতিরিক্ত ধর্মবোধ থাকিয়ায় হয়তো পরধর্মের গ্লানি আর ধর্মযুদ্ধেরও উব্জন হয়!

          সকাল দশটার আগতে গাড়ি ছাড়িল। হৈদ্দানি আর জোগার ধ্বনিতে গাড়িখান একবার গুমগুমাইল।... শাস্ত্রীয় আলাপ-আলোচনা, যত ধর্মীয় কথাবার্তা ছাড়া আর কুনো গল্প নাই। মাঝে মাঝেই উচ্চারিত হছে– হরি বোল, জয় রাধে আর হরে কৃষ্ণ।

          ঘন্টা কয়েক এক নাগারে চলার পর বাসখান দাঁড় করা হইল। ড্রাইভারেরও খানেক আড়াম দরকার। দীঘিলা পথের যাত্রী যেহেতু। থামি থামি না চলিলে এই দীঘিলা পথ যাত্রা করাও অসম্ভব ব্যপার। যার যা করির ইচ্ছা– করি নিল। সগারে মুখের আগপাক থাকি তিলকচন খানেক আবডাল হইল। সুরা পান না করিলে তার পক্ষে এই দীঘিলা পথ যাওয়া মুশকিল! তার বন্দোবস্ত আগোতে করি নিসে। দুনিয়াত কত ধরনের লোক থাকে! তীর্থযাত্রী হয়াও সুরা পান– কথাটা শুনায় যুনি মহাপাপ! 

          সগায় গাড়িত চড়িল। তিলকচনও নিজের সিটোত যায়া বসিল। হাতির মইধ্যে দাঁতাল আর মানষির মইধ্যে মাতাল– চিনিতে অসুবিধা হয় না। ঠিক একটা নিশা না হলেও তিলকচনের চোখু দুইটা যে নাল হইসে– দেখিলেই বুঝা যায়। মুখ খুলিলেই বিরাছে সুরা পানের দুর্গন্ধ। তিলকচনোক কিছু না কয়ায় সাবিত্রির মাও বাবলুর বাপের সাথে সিটখান অদল-বদল করি নিল। খুব তাড়াতাড়ি রহস্যটা বুঝিল বাবলুর বাপ। আগের থাকি জানে– তিলকচন বিশ্ব মাতাল! “আজি তীর্থযাত্রাত বিরিয়াও কুন হিসেবে মদ খায় লোকটা! জ্ঞান-হুশ কি আছে না নাই!” নানানখান কথা কিলবিলাছে বাবলুর বাপের মাথাত।

          থাকিতে থাকিতে আর সইহ্য করির পাইল না বাবলুর বাপ। কয়ায় ফেলাইল, “তিলক দা, তুই মদ খাসিস!”
          তিলকচন বাবলুর বাপের মুখের পাখে একবার দেখি নিল। আস্তে করি কইল, “কেনে!”
          “তীর্থযাত্রাত বিরিয়াও আজি তুই মদ খাসিস! হুশ ঠিক আছে তো তোর!”
          “হুশ-জ্ঞান সবে ঠিক আছে। চুপ করি থাক...।” কয়ায় চোখু দুইটা মুঞ্জিল তিলকচন।
          “এইটা কিন্তু তোর ঠিক হইল না তিলক দা!”
          চোখু দুইটা মুঞ্জিয়ায় পুছিল“কেনে ঠিক হইল না ?”
          “তীর্থযাত্রা করির বিরিয়াও তুই কুন হিসাবে মদ খাইস!”
          গাড়িত ততক্ষণে সগায় চুপচাপ। দুইটা লোকের গালা শুনা যাছে মাত্র। তবে সগায় বাবলুর বাপের পক্ষপাতি হইল। হওয়াটাও স্বাভাবিক ব্যপার। তিলকচন কইল, “কি মুশকিল! ভগবান কি কাহকো কইসে– তীর্থযাত্রাত বিরিয়া সুরা পান করিবেন না।”
          “তুই এইটা ভুল কলু তিলক দা!”
          “ঠিকটা তাহলে কি? আরে ধর্ম তো নিজ নিজ মনের ভিতিরা। কর্মতেই ধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়।”
          “তুই এমন আচরণ করিবু আগোত জানিলে মুই আসিলুং না হয় রে তিলক দা! ছিঃ ছিঃ ছিঃ...”
          “এলাও সমায় আছে নামি যা। কায় আটক করিসে তোক। যা, নামি যা।”
          “ফালতু কথা কইস না। গুরু করিস নাই তো– ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে আর কি বুঝিবু তুই! বেকার তর্ক করি লাভ নাই তোর সাথে!”
          তিলকচন মুচকি হাসি খালি একেনা কথায় কইল, “ পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতাহি পরমং তপঃ/ পিতারি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতা।” কায় না জানে এই শ্লোকের সারমর্ম? বাবলুর বাপও জানে, সাবিত্রির মাও’ও জানে। মাতাল হইলেও কথা দিয়া আর কায় পায় তিলকচনের সাথে! জবাবটা হয়তো ঠিকে দিসে। মুখখানে বন্ধ হয়া গেইল বাবলুর বাপের। শ্যাষ কালোত যে বাবলুর ঠাকুরদাক এক গিলাস জল দিবার মানষি ছিলো না। কাজে মান-সন্মানোত পড়ি উল্টাপাখে মুখ ঘুরি চুপচাপ নইল বেচারা বাবলুর বাপ। গোটায় গাড়িখান নিঃশব্দ হইল নিমেষেই। 

      গাড়ি প্রথমে উড়িষ্যার পুরী পৌঁছাইল। গন্তব্যস্থল– জগন্নাথ মন্দির। বহু তীর্থযাত্রী এটে তীর্থ করির উদ্দেশ্যে উপস্থিত। 

          বাবা জগন্নাথের দর্শন হইল। তীর্থযাত্রার মানেই তো হইল ভগবানের চরণ সেবা। কাজটা বাড়িত বসিয়াও করা যায়– যুদি মনটা ঠিক থাকে। তবে, আর কিছু হউক বা না হউক– তীর্থযাত্রা করিলে মন-মেজাটা খানেক ঝরঝরা হয়। মনের ভিতিরা যে পাপ– সেই পাপ থাকি মুক্তি লাভের আশায়‌ মানষি তীর্থস্থান ভ্রমন করে। তাতে পাপমোচন হয় কি না– উমুরায় জানে।

          গাড়ি আগাছে সোজা উত্তরাখন্ডের পাখে– হরিদ্বার। এটে নাকি শিবার জটা থাকি গঙ্গাদেবীর উব্জন। হরিদ্বার থাকি বিরিয়া যাবে চারধাম অর্থাৎ কেদারনাথ আর বদ্রীনাথ মন্দির। 

          সবে আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস মানে– ভগবান আছে, আর সেই ভগবানে সবসমায় মঙ্গল করিবে। এই আত্মবিশ্বাসটা না থাকিলে অদৃশ্য ঈশ্বর বা ভগবানের প্রতি মানষির বিশ্বাস থাকির পারে না। আর আত্মবিশ্বাস থাকিলেই যে সব মানষি অদৃশ্য মহাশক্তির প্রতি নিজেকে গতান করি দিবে তাও কিন্তু না হয়। এই একটা কারণের বাদেই মাঝে মাঝে কিছু নাস্তিক মানষি নজরোত পড়ে। এই দুই শ্রেণী অর্থাৎ আস্তিক আর নাস্তিক– দুইজনের যুক্তিতে দুইজনে ঠিক। কাহ হার মানিবার পাত্র না হয়। সুতরাং আস্তিকের সাথে নাস্তিকের বা নাস্তিকের সাথে আস্তিকের তর্কযুদ্ধ মানে মুর্খামি ছাড়া হয়তো আর কিছু হবার পারে না।

         হরিদ্বার, কেদারনাথ মন্দির ভালে ভালে দর্শন করা হইল। শ্যাষে বদ্রীনাথ মন্দির থাকি বিরিয়া তিলকচনের দেখা পাওয়া গেইল না। এই লোকটায় যত ঝামেলার ভান্ড! শুরু থাকিয়ায় বাকি মানষিলাক অশান্তিতে জ্বালে মারেছে। আস্তিকের দলোত নাস্তিক মিশিলে যা হয়!... অনেকেই গাড়িত উঠি বসিল। কাহ কাহ বিরাইল তিলকচনের খোঁজোত। লোকটা নিশ্চয় কুনো মাতালের ঘাঁটিত যায়া বসি পড়িসে। তাছাড়া আর যাবে কোটে!... সেলা প্রায় দুপোর ২-টার মতন। মাথার উপুরা সূরজের আলো অগুনের মতন তাপাছে! আগতে জানা থাকিলে এই লোকটাক কাহ আনিল না হয়! ছাড়িয়াও যাওয়া যাছে না। সগায় অধৈয্য হয়া গেইসে। সেই দুপোর থাকি খোঁজ-খবর নাই। বাড়ি আর টাড়ি কি কিছুই বুঝে না লোকটা! মাতালোক সঙ্গ করিলে যা হয়! 

          সইন্ধ্যা হয়া গেইল। সেলাও তিলকচন কাহরে চোখুত পড়িল না। তাহলে কি উধাও হয়া গেইল! যত সমস্যার মূল এই মাতাল লোকটা! ড্রাইভার তো ধৈয্যশক্তি হারে গাড়িয়ে স্টার্ট করিল।... এমন সমায় খবর পাওয়া গেইল, কুন একটা বুড়া নাকি শশ্মানের চিতাত পড়ি আছে! সারা-শব্দ কিছু নাই। ফুলফুলা সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পিন্দা আর ভুলভুলা পাকা চুলি। হয়তো কাহ মরাটাক নাই ছুবিতে ফ্যালে দিয়া পালাইসে। বহু লোকের ভিড় জমিসে মরাটাক কেন্দ্র করি। প্রশাসনের লোক সেলাও আইসে নাই। 

          ভিড় ঠেলি বাবলুর বাপে কুনো মতনে আগে গেইল। চিনির পাইল না লোকটা কায়! হবার পারে তিলকচন বুড়ায়! কিন্তু– মানষিটাক পরিস্কার চিনা যে মুশকিল! উবুরি হয়া চিতার উপুরা সকসক করি পড়ি আছে ! ভয়ে কাহ হাত নাগায় নাই। ফাকোতে কায় দোষের ভাগী হবে! কায় কৈফৎ দিবে থানা-পুলিশ-কোট-কাচারিত! তার চাইতে হাত না নাগায় অনেক ভাল। 

          অন্ধকার ঘিরি নিসে ততক্ষণে। জ্বলেছে দুই-একটা টর্চ লাইট আর ল্যাম্পোস্টের আলো। হাল্লা উঠিল– “বুড়া মরে নাই, বুড়া মরে নাই।” অর্থাৎ বুড়া নড়ি-চড়ি উঠি বসির চেষ্টা করিসে। এই শুনি বাবলুর বাপ পাছিলা পাখ থাকি আরও আগপাখে যাবার চেষ্টা করিল। দায়-দায়িত্ব বুলিও একটা জিনিস আছে।... কাহ কাহ তো ভয়ে থুরিকাপ! মরা মানষিটা ক্যাংকরি জিউ ফিরি পাইল...! কাহ উমুলি হাসি উঠিল। প্রশাসনের লোক ততক্ষণে উপস্থিত। পুছা-ঘুংটা করি বুঝির পায়– বুড়া একজন তীর্থযাত্রী। নাম– তিলকচন। মদ খায়া নিশাতে টুল হয়া আছে। বয়সটা যুদি কম হইল হয় – তাহলে হয়তো পিটির বাকলা খসি গেইল হয় পুলিশের ডান্টা খায়া। কিন্তু, বুড়ার বয়সটা যে আশির ঘর পার করিসে। কায় হাত তুলিবে উয়ার গাত! 

          আর কুনোটে না যায়া গাড়ি সোজা ফিরতি পথ ধরিল। বাকি সব প্ল্যান ক্যান্সেল। যত নষ্টের গোড়া তিলকচন! এই মানষিটার সাথে তীর্থযাত্রা করা অসম্ভব ব্যপার! তা না হইলে এই নাস্তিক মানষিটার পাপের বাওছিঁটা নাগির পারে আস্তিক মানষিলাকে...!

তারিখ: 30.12.2021

Post a Comment

Previous Post Next Post